সারকথা আমার আলোচনার উপজীব্য কবি জসীমউদ্দীনের উপন্যাস বোবা কাহিনী (১৯৬৪)। আলোচনার শুরুতে শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দগুলোর সারমর্ম হাজির করছি, যাতে আলোচনাটির অভিমুখ ও পথচিত্র স্পষ্ট হয়। আমার বিবেচনায় বোবা কাহিনী তে যে বর্গের মানুষের কথা চিত্রিত হয়েছে, তাকে বিদ্যায়তনিকভাবে নিম্নবর্গ বা সাবঅলটার্ন বলা যায়। এখানে ‘নিম্নবর্গ’ শব্দটি আমি কেবল অর্থনৈতিক দরিদ্রতা বোঝাতে ব্যবহার করছি না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বহীনতা, ক্ষমতাহীনতা ও সামাজিক শ্রবণবঞ্চনার অর্থে ব্যবহার করছি। ‘ব্যাপার’ শব্দটিকে এখানে জীবনাচরণ, ব্যবসা, লেনদেন ও সম্পর্ক—এসব অর্থে হাজির করেছি। ‘কোম্পানি’ শব্দটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে নির্দেশ করে। আর ‘বাটখারা’ শব্দটি এখানে পরিমাপক, নির্ধারক, এমনকি শাসক অর্থেও ব্যবহৃত। এই আলোচনার কেন্দ্রীয় অভীষ্ট হলো দেখানো যে নিম্নবর্গের জীবন-ব্যাপারে ঔপনিবেশিক বাটখারা কীভাবে পরিমাপক, নির্ধারক ও শাসক হিসেবে কাজ করে এবং কীভাবে আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে আজাহেরের মতো চরিত্রকে বোবা করে তোলে। কাহিনিসংক্ষেপ ও আলোচনার পটভূমি প্রথমেই পাঠকের সুবিধার্থে উপন্যাসটির একটি সারসংক্ষেপ হাজির করছি। উপন্যাসের পটভূমি ও কাহিনিসংক্ষেপ পেশ করার কাজটি আমি করব অগ্রজ দুজন প্রাবন্ধিকের সাক্ষ্যসহকারে। ‘জসীম উদ্দীনের উপন্যাস: নূতন পাঠ’ প্রবন্ধের লেখক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের পটভূমি ও বিষয় নিয়ে বলছেন, ‘গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকের বাংলার প্রত্যন্ত, প্রায় দুর্গম গ্রাম এ উপন্যাসের পটভূমি। সেখানকার মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষ এই উপন্যাসের চরিত্র। তাঁদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ এ উপন্যাসের বিষয়।’ এরপর আবদুল মোতালেব শেখের লেখা ‘জসীম উদ্দীনের বোবা কাহিনী: লোকসংস্কৃতির উপাদান’ রচনার একটি অংশ এখানে কাহিনিসংক্ষেপ হিসেবে পেশ করছি। তিনি বলছেন, ‘এ উপন্যাসের নায়ক আজাহের এক ছিন্নমূল চাষীসন্তান। লাঞ্ছনা-বঞ্চনা বাল্যকাল থেকেই তার নিত্যসঙ্গী। তবুও সে স্বপ্ন দেখে সুখী জীবনের। তাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করে যায় বেশি ফসল ফলিয়ে সুখের নাগাল পেতে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে পুত্র বছিরকে উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ করার স্বপ্ন দেখে সে।’ সাবঅলটার্ন তত্ত্ব ও আজাহেরের বোবাকরণ এই পর্যায়ে আমার উপপাদ্য এই যে জসীমউদ্দীনের বোবা কাহিনী —অর্থাৎ মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের কাহিনি—গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘Can the Subaltern Speak?’ প্রশ্নটির আলোকে পাঠের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচ্য উপন্যাস থেকে উপাত্ত হাজির করার আগে সাবঅলটার্ন তত্ত্বের একটি কার্যকর সংজ্ঞা সংক্ষেপে পেশ করা দরকার। উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্বে ‘সাবঅলটার্ন’ বলতে সেসব মানুষ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কেবল দরিদ্র বা সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে নয়, বরং আধিপত্যশীল জ্ঞানব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আইনি ভাষা ও ক্ষমতার স্বীকৃত পরিসর থেকেও বিচ্ছিন্ন। ফলে তাদের কণ্ঠস্বর থাকলেও তা সামাজিকভাবে শোনা, অনুবাদ, স্বীকৃত ও কার্যকর হয় না। এই অর্থেই আজাহেরের কাহিনি একটি সাবঅলটার্ন কাহিনি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ঔপনিবেশিক আইন ও নিম্নবর্গ জোর দিচ্ছি এই কথায় যে আমাদের উপন্যাসের কাহিনির সময় ঔপনিবেশিক আমল এবং সে আমলের আইন, বিশেষত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে বিদ্যমান। এর প্রমাণ আমরা কাহিনির পরতে পরতে পাই। তার বিবরণে যাওয়ার আগে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বেঙ্গল প্রভিন্সসহ ভাটির প্রদেশগুলোয় কী দুর্দশা ডেকে এনেছিল, তা দু-একজন ঔপনিবেশিক শাসকের মুখেও জেনে নেওয়া যাক। ১৮১৯ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সের গভর্নর জেনারেল ফ্রান্সিস রওডন-হেস্টিংস ভাটির প্রদেশগুলোর ওপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব সম্পর্কে রিপোর্টে লিখছেন— ‘Yet this truly benevolent purpose, fashioned with great care and deliberation, [the Permanent Settlement] has, to our painful knowledge, subjected almost the whole of the lower classes throughout these provinces to most grievous oppression, an oppression, too, so guaranteed by our pledge, that we are unable to relieve the sufferers.’ দেখা যাচ্ছে, ঔপনিবেশিক শাসকেরও এই মত যে কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে কর সংগ্রহ নিশ্চিত করার তথাকথিত সুচিন্তিত পরিকল্পনা, অর্থাৎ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, তার অভীষ্ট কাজ করল না; অন্যদিকে সমগ্র নিম্নবর্গকে চরম নিপীড়নের শিকারে পরিণত করল। তাতে শাসকের কী লাভ হলো? শাসকের নগদ লাভ নিম্নবর্গের কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া। আমরা সে কথার স্বীকৃতি পাই আরেক ঔপনিবেশিক শাসক লর্ড বেন্টিঙ্কের রিপোর্টে। কোম্পানি যখন স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহের আশঙ্কা করছে, তখন বেঙ্গলের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক অভয় দিচ্ছেন—সেই আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষায়, ‘that insurrection or hostile opposition to the will of the ruling province may be affirmed to be an impossible danger.’ শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহ অসম্ভব বলার কারণ হিসেবে ১৮২৯ সালের সেই রিপোর্টে তিনি স্থানীয় মানুষের স্বভাবকে দায়ী করেন এবং সেই সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাবকেও কৃতিত্ব দেন। তিনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেন: ‘If, however, security was wanting against extensive popular tumult or revolution, I should say that the Permanent Settlement, which, though a failure in many other respects and in its most important essentials, has this great advantage at least, of having created a vast body of rich landed proprietors deeply interested in the continuance of the British Dominion and having complete command over the mass of the people;’ আমরা যদি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের এই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকে উপনিবেশবিরোধী দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে ধরা পড়ে—স্থানীয় মানুষের এই ‘সাহসের অভাব’ বা ‘নতমুখী স্বভাব’ নিপীড়নমূলক শাসনের ফলেই সৃষ্ট। তবে তাঁর দৃষ্টিও সমকালীন বাস্তব কারণটি দেখতে ভুল করেনি। তাই জনগণের ওপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় পারমানেন্ট সেটেলমেন্টের ভূমিকার কথাতেই তিনি জোর দিয়েছেন। বোবা কাহিনী তে আমরা দেখি, আজাহেরের উন্নতির প্রচেষ্টা বারবার ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা ব্যাহত হয়। ব্যবস্থার কাছে পর্যুদস্ত হতে হতে সে হারাতে থাকে তার কর্তাসত্তার প্রকাশক কণ্ঠস্বর। গায়ত্রী স্পিভাক যখন বলেন ‘Can the Subaltern Speak?’, তখন ‘speak’ শব্দটি নিছক কথা বলার অর্থে নয়; বরং নিজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব, বক্তব্যের সামাজিক স্বীকৃতি, শ্রবণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক কার্যকারিতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কথা বলা যথেষ্ট নয়; কথা এমন সামাজিক কাঠামোয় পৌঁছাতে হবে, যেখানে তা গ্রাহ্য, অনুবাদযোগ্য ও কার্যকর। এই অর্থে আজাহের কথা বলতে পারে, কিন্তু ‘স্পিক’ করতে পারে না। তার বোবাত্ব শারীরিক নয়; আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার স্তরে তার বক্তব্যের অগ্রাহ্য হওয়া। এদিক থেকে উপন্যাসের শিরোনাম ‘বোবা কাহিনী’ অত্যন্ত ইঙ্গিতময়। আজাহের তো আক্ষরিক অর্থে বোবা নয়; কিন্তু সমাজের স্বীকৃত শ্রোতা ও ক্ষমতার ভাষার সামনে সে কার্যত বোবা হয়ে পড়ে। উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছদের সূচনাবাক্য—‘আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?’—এই প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতারই ঘোষণা। ‘আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?’ বলাই বাহুল্য, প্রশ্নটি আলংকারিক; এর লক্ষ্যার্থ হলো আজাহেরের কাহিনি কেউ শোনে না, শুনবে না। যারা আজাহেরের কাহিনিতে আজাহেরের সমতলে আছে, এটা তাদেরও কাহিনি; ফলে তাদের শোনা না-শোনার কথা হচ্ছে না। তারা তো আজাহেরের সঙ্গেই কাহিনিটি যাপন করছে। আর আজাহের যেহেতু সমাজের নিচুতলে অবস্থান করে, লেখক শ্রোতাদের শনাক্ত করছেন মধ্য ও উপরিতলের মানুষদের মধ্যে। এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: আজাহেরের কাহিনি যদি আজাহের নিজে বলে, তাহলে শোনার লোক পাওয়া যাবে না। তাই লেখককে আজাহেরের কাহিনি লিখতে হয়েছে। এখানে লেখক কেবল আজাহেরের কাহিনি বলার দায় নিয়েছেন তা–ই নয়; তাঁর কাহিনির মধ্যকার ঘটনাগুলোতেও দেখা যায়, আজাহের তার ঊর্ধ্বতনের দ্বারাই ব্যক্ত হচ্ছে। আজাহের তার গ্রামের মোড়লের জন্য দিনমজুরি করে। আজাহেরের বিয়েতে তাকে প্রতিনিধিত্ব করে সেই মোড়ল; কেননা, দর–কষাকষি করতে হবে এমন পরিস্থিতিতে ‘সে ভালোমত করিয়া গুছাইয়া বলিতে পারে না’; তার গা কাঁপে। অবশ্য যাদের সঙ্গে তার দর–কষাকষির সম্পর্ক নেই, তাদের সে ঠিকই নির্দেশ দিতে পারে। যেমন ‘গেট ধরার বকশিশ’ নিয়ে দর–কষাকষি হবে—এমন পরিপ্রেক্ষিতে বরযাত্রীদের সে বলে, ‘তোরা কেউ কথা কবি না, যা কয় আমাগো মোড়ল কবি।’ কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে আবিষ্কার করে, মোড়ল তাকে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করে না। মোড়ল দর–কষাকষিতে আজাহেরের দুই পয়সা বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে এমনভাবে ছোট করে, যা তার নিজনির্ধারিত ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। সে ভাবে, মোড়ল বিয়ের গেটে দাঁড়ানো কনেপক্ষকে আর চার আনা দিলেই পারত। তাকে এতটা গরিব দেখানো ঠিক হয়নি মোড়লের। সে যেহেতু গতর খেটেই মোড়লের দেনা শোধ করে, চার আনা বেশি দিলে নাহয় এক দিন বেশি খেটে শোধ করে দিতে পারত। এতে তার মর্যাদা রক্ষা পেত। আজাহেরের এই মর্যাদার চেতনাটুকু আছে; কিন্তু সে কেবল ভাবে, ব্যক্ত করতে পারে না। এটি বোবা কাহিনী র একটি লাইট মোটিফ; এই মোটিফ বারবার ফিরে আসে বিভিন্ন ঘটনায়। ঔপনিবেশিক শাসক হয়তো এটিকে আজাহেরের স্বভাব হিসেবে দেখবেন। কিন্তু আমরা উপন্যাসের কাহিনির বরাতে দেখব, এটি আর্থসামাজিক কাঠামোগত নিষ্পেষণের ফলে অর্জিত একটি বৈশিষ্ট্য। এই প্রস্তাবের পক্ষে একটি উদাহরণমূলক ঘটনায় দেখা যায়, আক্ষরিক অর্থে কোম্পানির বাটখারা আজাহেরকে ভড়কে দেয় এবং দর–কষাকষিতে আজাহেরের ঠকে যাওয়ার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। কোম্পানির বাটখারা: বাজার, মাপ ও ভাষার ক্ষমতা প্রথম ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিত দেওয়া যাক। আজাহেরের সামাজিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তার প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের কমতি নেই। লেখকের ভাষায়, ‘মাথা গুঁজিবার মত দুখানা ঘর, লাঙল চালাইবার মত কয়েক বিঘা জমি আর পেট ভরিয়া আহার;-এরি স্বপ্ন লইয়া তাহারা’—অর্থাৎ আজাহের ও তার বউ—‘কত চিন্তা করে, কত পরামর্শ করে, কত ফন্দি-ফিকির আওড়ায়।’ এই যেমন সে মোড়ল থেকে জমি বর্গা নিয়ে পাট চাষ করে। সে তার বউকে বলে, ‘[...] আমাগো দিন এই বাবেই যাবি না। আশ্বিন মাসে পাট বেইচা অনেক টাহা পাব।’ ভাদ্র মাস আসে, সঙ্গে আসে পাটের ভালো ফলন। পাট কিনতে তার বাড়িতে আসে পাটের ব্যাপারী। এ ব্যাপার বা ব্যবসার চিত্রটি আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাটের ব্যাপারী অছিমদ্দী আজাহেরকে পাটের দাম কমিয়ে দিতে চায়। আজাহের জানে, ফরিদপুরে পাটের দাম ছয় টাকা মণ। অছিমদ্দী তাকে দেয় মণপ্রতি সাড়ে চার টাকা। সে কেবল দামই কম দেয় তা নয়; মাপের সময়ও হেরফের করে, ঠকায়। আজাহের তার পাটের পরিমাণ আগেই মেপে রেখেছিল—ছাব্বিশ মণ। ব্যাপারীর পাল্লায় মাপ দেওয়ায় সেই একই পাটের ওজন আসে বিশ মণ। আজাহের পাটের দাম ও ওজন নিয়ে দর–কষাকষি করতে গেলে ব্যাপারী তার কণ্ঠস্বর দমন করতে কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করে। আজাহের দমে যায়। কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ডের ব্যবহারটি কেমন, তা আজাহের ও ব্যাপারীর সংশ্লিষ্ট সংলাপের বাছাই করা বাক্যের মাধ্যমে দেখা যাক। আজাহের: ‘তা বেপারীর পো, চার টাকার পাট আমি কিছুতেই ছাড়ব না।’ অছিমদ্দী: ‘আরে মিয়া তোমার পাট ত তেমুন বাল না। কোম্পানী-আলা পাট নিতিই চায় না।...। আজাহের: ‘হুনলাম ফইরাতপুরি পাটের দাম ছয় টাহা মণ।’ অছিমদ্দী: ‘[...] যাও না ফইরাতপুর পাট লয়া। তোমার ভিজা পাট দেকলি পুলিশেই তোমাকে দৈরা দিব্যানে।’ এর সঙ্গে অছিমুদ্দিন আজাহেরের মনোভাব বুঝে আরও আট আনা বাড়িয়ে দেয়; আজাহেরকে মিঞা বলে সম্বোধনও করে। আজাহের ওইটুকু সম্মান পেয়েই গলে যায়, মণপ্রতি সাড়ে চার টাকা দরেই তার পাট বেচতে রাজি হয়ে যায়। এরপর পাটের ওজন করা নিয়ে যে সংলাপ, তাতেও আমরা দেখতে পাই, কোম্পানির পুলিশ ও বাটখারার ভয় দেখিয়ে আজাহেরকে ঠকানো হচ্ছে। এবারও তা সংশ্লিষ্ট সংলাপের বাছাই করা বাক্যের মাধ্যমে দেখা যাক। আজাহের: ‘আমি নিজে ওজন দিছিলাম। পাটের ওজন ঐছিল ছাব্বিশ মণ। কিন্তুক আপনার ওজনে ঐল মোটে কুড়ি মণ।’ অছিমদ্দী: ‘[...] কোথাকার নকল পালা-পৈড়ান দিয়া তুমি ওজন দিছিলা। তাইতি ওজনে বেশী ঐছিল। একথা কারও কাছে কইও না, যে তোমার কাছে নকল পালা-পৈড়ান আছে। একথা পুলিশ জানতি পারলি এহনি তোমারে থানায় ধইরা নিয়া যাবি। আমার পালা-পৈড়ানে কোমপানি বাহাদুরের নাম লেহা আছে। ইংরাজী পড়বার পার মিঞার বেটা?" স্পষ্টতই আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোম্পানির বাটখারা, কোম্পানির ইংরেজি এবং কোম্পানির পুলিশ—তথা ঔপনিবেশিক ক্ষমতা—কীভাবে একজন বর্গাচাষিকেও সন্ত্রস্ত করে তোলে: ঔপনিবেশিক বাটখারা সহি, প্রান্তিক বর্গাচাষির বাটখারা নকল। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দেয়—শ্রমের ফসল নিম্নমানের; তদুপরি ভেজা বিধায় জেলে যাওয়ার ভয় আছে। বর্গাচাষি নিজের পক্ষের বক্তব্য ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কাছে তুলে ধরতে পারে না। কেননা, সে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে পারে না। যে ভাষায় কথা বললে তার কথা গ্রাহ্য হবে, সে সেই ভাষায় কথা বলতে পারে না; এই অর্থে সে কথা বলতে পারে না—he cannot speak. আজাহেরের কাহিনির এই পর্বে আমরা দেখতে পেলাম, ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা একটি বোবাকরণ-ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে, যার শিকার হচ্ছে নিম্নবর্গের মানুষ। ব্যবস্থাটি মনস্তত্ত্বের এত গভীরে শিকড় গেড়েছে যে উৎপাদক নিজের উৎপাদনের গুরুত্ব ভুলে যেতে বাধ্য হয়। যে পাট ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক চাকা ঘোরাতে কাজ করে, সেই পাট উৎপাদন করেও আজাহের ভাবতে বাধ্য হয়—তার উৎপাদিত পাট আসলে কিছু নয়; এর বিনিময়ে যে টাকা পাচ্ছে, তা তার শ্রমের মূল্য নয়, বরং অনুগ্রহ মাত্র। ঔপন্যাসিক আজাহেরের এই ভাবনার করুণ বর্ণনা দেন এভাবে: ‘এতো টাকা একসঙ্গে পাইয়া খুশীতে আজাহেরের ইচ্ছা করিতেছিল, অছিমদ্দী বেপারীর পায়ের কাছে লুটাইয়া ছালাম জানায়। সে যেন নিতান্ত অনুগ্রহ করিয়াই তাকে টাকাগুলি দিয়া গেল। পাটগুলি যে লইয়া গেল, সে যেন একটা তুচ্ছ উপলক্ষ মাত্র।’ পরিতাপের বিষয়, দর–কষাকষির সময় ঔপনিবেশিক বাটখারা, ইংরেজি ভাষা এবং পুলিশের ভয় দেখিয়ে যে তাকে ঠকানো হলো, আজাহের তা পুরোপুরি অজ্ঞাত নয়। কিন্তু সে এই অন্যায়কে নিজের উৎপাদন ও নিজের মর্যাদা তুচ্ছ করে বুঝে নিতে বাধ্য হয়। উপরন্তু তার বউ যখন বলে যে তাকে মাপে ঠকানো হয়েছে, মোড়লকে ডেকে এনে তার সামনে মাপের কাজটি করা যেত, তখন আজাহের স্বীকার করে যে কথাটি তার মনে আসেনি। এখানেই আবার প্রতিষ্ঠিত হয় যে উৎপাদক হিসেবে তার শ্রম আছে, কিন্তু নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই। আরও পরিতাপের বিষয়, এই ব্যর্থতা সে নিয়তির ভাষায় অনুবাদ করতে বাধ্য হয়। তার ভাষায়, ‘খোদা নছিবে যা লেখছে তাই তো আমি পাব। এর বেশি কিডা দিবি।’ এ কথা শুনে আজাহেরের বউও বোবা হয়ে যায়। কেননা, মন যত খুঁতখুঁত করুক, ‘এ কথার উপরে আর কথা চলে না।’ অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শোষণ তার কাছে সরাসরি রাজনৈতিক অন্যায় হিসেবে নয়, নিয়তির ভাষায় অনূদিত হয়ে ফিরে আসে। আদালত, চাপরাস ও প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা প্রশ্ন উঠতে পারে—ঔপনিবেশিক শাসন তো একটি আইনব্যবস্থাও; এখানে আইন আছে, অন্যায়ের শিকার হলে প্রজারা সেই আইনের আশ্রয় নিতে পারে। দেখা যাক, আমাদের আজাহেরের বেলায় এই ব্যাপারে কী ঘটে। বিয়ের খরচ মেটাতে আজাহের গ্রামের কুসীদজীবী, তথা সুদের ব্যাপারী শরৎ সাহার কাছ থেকে পনেরো টাকা ঋণ নিয়েছিল। পাট বেচে সেই টাকা সুদে-আসলে ফেরতও দিতে গিয়েছিল সে। সাহারা একসময় ছিল বণিক; কিন্তু বর্তমানে সুদের ব্যবসা করে প্রচুর ধনসম্পদ ও কুখ্যাতি কুড়িয়েছে। কুখ্যাতির কারণ গরিব চাষাদের বিপদে ফেলে উচ্চ সুদ আদায়। যেমন শরৎ সাহা যখন জানে আমাদের আজাহের পাট বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা পেয়েছে, তখন সে আজাহেরের কাছ থেকে ঋণের টাকা ফেরত না নিয়ে উল্টো তাকে জমি কেনার দুর্বুদ্ধি দেয়। আজাহেরও ভাবে, নিজের জমি হবে, সেই জমিতে ফসল ফলিয়ে সে ভাগ্য ফেরাবে। কিন্তু দেশের আইনের সুবিধা সে নিতে পারে না। বাড়ি থেকে টাকা এনে জমির দাম হিসেবে শরৎ সাহার হাতে তুলে দেয়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষার অভাবে কোনো দলিল বা সাক্ষীর সুবিধা সে নিতে পারে না। বাকি থাকে কিছু টাকা, যা সে ফসল বিক্রি করে পরিশোধ করবে। অতঃপর আমরা দেখি, সেই জমিতে সে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরিশ্রম করে ব্যাপক ফসল ফলায়। কিন্তু সেই ধান কেটে নিতে আসে শরৎ সাহা; সে অস্বীকার করে যে আজাহেরের কাছে জমি বিক্রি করেছিল। জোর করে ফসল কেটে নিতে থাকে। তখন আজাহের চিৎকার করে কোম্পানিওয়ালার দোহাই দেয়, ইংরেজ বাহাদুরের দোহাই দেয়, মহারানি মায়ের দোহাই দেয়। তাতে শরৎ //// সাহা থামে না; সঙ্গে করে নিয়ে আসা কামলাদের বলে হাত চালিয়ে ধান কাটতে। কারণ, সে জানে, কোম্পানি তার পক্ষে থাকবে। আজাহেরের চিৎকার শুনে ছুটে আসে শরৎ সাহার ভাষায় ‘ছোটলোক’, ‘ছোট জাত’ গ্রামের মাতবর মিনাজদ্দী ও তার লোকেরা। মিনাজদ্দীরও শরৎ সাহার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে; ফলে সে জানে শরৎ সাহা মিথ্যা বলছে। তাই তার দলবল নিয়ে আজাহেরের পক্ষে খেতের ধান কাটতে শুরু করলে সাহাজি পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং মিনাজদ্দীকে সদর কোর্ট, দেওয়ানি আদালতের ভয় দেখায়। বলে, সাপ নিয়ে খেলার পরিণাম ভালো হবে না; বড়শিতে বিঁধিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে নাগরদোলায় চড়াবে, তথা জেলের ভাত খাওয়াবে। অবশেষে সাপ আসে আজাহেরের বাড়িতে। একজন খাকি পোশাক পরা লোক এসে খোঁজে ‘এক নম্বর আসামি আজাহের’-কে। আজাহেরকে না পেয়ে তার ঘরের বেড়ার সঙ্গে সমন বেঁধে দিয়ে যায়। লোকে বলে, ওই খাকি পোশাক পরা লোকটি আদালতের পিয়ন। পুঁথিপাঠক বচন মোল্লার সাহায্যে সেই সমনের পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে সবাই জানতে পারে, তাতে আজাহেরকে আসামি করা হয়েছে। বচন মোল্লার পরামর্শে সে ওই সমন আগের স্থানেই বেঁধে রেখে দেয়। কিন্তু এই সমন নিয়ে আতঙ্ক সে বেঁধে রাখতে পারে না। ‘রাত্রে বিছানায় শুইয়া শুইয়া আজাহেরের ঘুম আসে না। সেই কাগজের টুকরাটি হিংস্র অজগর হইয়া যেন তাহাকে কামড়াইতে আসে।’ আরেক দিন সে স্বপ্নে দেখে, ‘তাহার শিশু পুত্রটি কোলের উপর বসিয়া খেলা করিতেছে। হঠাৎ সেই কাগজের টুকরাটি প্রকাণ্ড একটা হা করিয়া আসিয়া তার সেই শিশু পুত্রটিকে গ্রাস করিয়া ফেলিল। চিৎকার করিয়া করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া আজাহের কোলের ছেলেটিকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরে।’ এই স্বপ্ন বাস্তব হতে একটু সময় নেয়। পাঁচ বছর পর শরৎ সাহা গোটা দশেক লোক নিয়ে আদালতের পিয়নসহ আজাহেরের বাড়িতে আসে। যদিও আজাহের তার ঋণ শোধ দিয়েছে, তবু প্রমাণের অভাবে তা চক্রবৃদ্ধি হারে আরও যেন কী প্রকারে পাঁচ শত টাকা হয়েছে। যদি সে তা না দিতে পারে, তাহলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক হওয়ার ডিক্রি হয়েছে। কোমরে আদালতের চিহ্ন বা চাপরাস পরা পিয়ন সে কথাই ধমকের সঙ্গে বলল। সুদ উশুল করার লক্ষ্যে সাহার লোক হালের গরু দুটি নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আজাহের এবারও কোম্পানির দোহাই দেয়, মা মহারানির দোহাই দেয়, আদালতের পিয়নের পা জড়িয়ে ধরে। পিয়ন বলে, ‘রাজার হুকুম, আমার কি সাধ্য আছে মিঞা সায়েব।’ আজাহেরের কান্না শুনে অনেকে তার বাড়িতে জড়ো হয়; মাতবর মিনাজদ্দীও আসে। সবাই দেখে আদালতের সেই পিয়নের ‘মাজায় আদালতের ছাপমারা চাপরাশ ঝকমক করিতেছে’; ফলে ‘কেহই আজাহেরকে কোন সাহায্য করিতে সাহস পাইল না।’ সাহার লোক তখন আজাহেরের ঘরের চাল, ডাল, বীজধান—সব নিতে উদ্যত হয়। আজাহেরের বউ পথ আগলিয়ে দাঁড়ালে তাকে তারা অসম্মান করতে যায়। মাতবর মিনাজদ্দী প্রতিবাদ করলে আদালতের পিয়ন এগিয়ে এসে তাকে নিবৃত্ত করে, ভয় দেখায়, আইন ভঙ্গ করলে আজাহেরের ওপর এবং যারা তাকে সাহায্য করতে এসেছে, তাদের ওপর কী ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসবে, তার বিশদ বর্ণনা দেয়; পুলিশি নির্যাতনের উদাহরণ দেয়। শুনে মিনাজদ্দী দমে যায়। তাকে চুপ হতে দেখে পিয়ন বলে, ‘আমরা যে গ্রাম-ভরে এতো বুকটান করে ঘুরি সে নিজের জোরে নয় মাতবর সাহেব!