শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) সব সময় সবচেয়ে কার্যকর, উপকারী ও অনবদ্য মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রধান ১৫ কৌশল ২ পর্বে আলোচনা করা হলো। আজ প্রথম পর্ব । মহানবী সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন প্রতিনিধিরূপে, যে তাদের পাঠ করে শোনায় তাঁর আয়াত, তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ২) আমাদের রাসুল মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন উম্মি বা নিরক্ষর, অর্থাৎ জাগতিক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অক্ষরজ্ঞান লাভ করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও আদর্শ শিক্ষক। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন তাঁর জবান, কর্ম, আচরণ ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের মাধ্যমে। মানবজীবন, জগৎ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা ও কালোত্তীর্ণ দিকনির্দেশনা বিদ্যমান। নবীজির শিক্ষাদানের একটি প্রধান মাধ্যম ছিল সরাসরি নিজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দিতেন, তা প্রথমে নিজে করে দেখাতেন। ‘আমি তো শিক্ষক হয়ে এসেছি’ নবীজিকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে শিক্ষকরূপেই প্রেরণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি নিজেও ঘোষণা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘একদিন আল্লাহর রাসুল ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি দুটি হালকা বা বৃত্তাকারে বসা দল দেখতে পেলেন। প্রথম দলটি কোরআন তেলাওয়াত করছিল এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছিল। দ্বিতীয় দলটি জ্ঞান অর্জন করছিল এবং অন্যদের শিক্ষা দিচ্ছিল। নবীজি বললেন, উভয় দলই কল্যাণের ওপর রয়েছে। এই দলটি কোরআন তেলাওয়াত করছে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে; আল্লাহ চাইলে তাদের দিতেও পারেন, আবার না-ও দিতে পারেন। আর এই দলটি শিক্ষা দিচ্ছে এবং শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর আমি তো শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। এরপর তিনি সেই শিক্ষাদানকারী দলের সঙ্গেই বসে গেলেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯) শিক্ষাদানে তাঁর হাতে-কলমে ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির কয়েকটি কৌশল হলো: পার্থিব জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের সমন্বয় যেভাবে করবেন ১. বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা নবীজির শিক্ষাদানের একটি প্রধান মাধ্যম ছিল সরাসরি নিজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দিতেন, তা প্রথমে নিজে করে দেখাতেন; যেন অন্যরা তা দেখে সহজে অনুসরণ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১) মিম্বার তৈরির প্রেক্ষাপটসংবলিত একটি হাদিসে সাহল ইবনে সাদ (রা.) বলেন, ‘আমি দেখেছি, মিম্বারের ওপর আল্লাহর রাসুল (সা.) নামাজ আদায় করেছেন। এর ওপর উঠে তাকবির দিয়েছেন এবং এখানে দাঁড়িয়ে রুকু করেছেন। অতঃপর পেছনের দিকে নেমে এসে মিম্বারের গোড়ায় সিজদা করেছেন। নামাজ শেষে সমবেত লোকদের দিকে ফিরে বলেছেন, হে লোকসকল, আমি এটা এ জন্য করেছি যে তোমরা যেন আমার অনুসরণ করতে পারো এবং আমার নামাজ শিখে নিতে পার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯১৭) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মহানবী আমাদের বিরক্তি ও অবসাদের আশঙ্কায় দিনক্ষণ দেখে দেখে উপদেশ দিতেন। এতে স্পষ্ট হয় যে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য নবীজি হাতে-কলমে এবং দৃশ্যমান পদ্ধতিতে গুরুত্ব দিতেন। ২. পর্যায়ক্রমিক শিক্ষাদান তিনি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রম ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেন। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তিনি অল্প অল্প করে শেখাতেন; প্রথমে মৌলিক ও পরে আনুষঙ্গিক বিষয়। যখন মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে পাঠালেন, তখন বললেন, ‘তুমি এমন এক জাতির কাছে যাচ্ছ, যারা আহলে কিতাব। সুতরাং তুমি প্রথমে তাদের এই সাক্ষ্য দেওয়ার দিকে আহ্বান জানাবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। যদি তারা এ কথা মেনে নেয়, তবে তাদের জানিয়ে দেবে যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন; যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করা হবে এবং দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৯৬) ৩.