ইচক দুয়েন্দের মহাগপ্প টিয়াদুর একটি সর্বপ্রাণবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প। এর কাহিনিজগৎ মানুষ, পাখি, উদ্ভিদসহ সকল প্রাণসত্তাকে একই যৌথ রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিসরে স্থাপন করেছে। সৃষ্টিজগতের প্রকৃত বাস্তবতা এ রকমই তো আসলে। সকল সৃষ্টিসত্তার দ্বান্দ্বিক অথচ পরস্পর নির্ভরশীল সহাবস্থানের এক অসামান্য ঐক্যবদ্ধ পরিসর এই পৃথিবী যাকে আমরা, মানুষেরা, খণ্ডবিখণ্ড করেছি, নিজেদের সাধ্যমতো দখল করেছি, আধিপত্য বিস্তার করার নামে নিজেদেরসহ সকল প্রাণসত্তার বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছি। চূড়ান্তে আমরা স্বনির্মিত ফাঁদে আটকা পড়েছি। আমরাই আবার দুনিয়ার ধ্বংস-আশঙ্কা আবিষ্কার করে ঘোষণা দিচ্ছি—আমরা আজ বিপদাপন্ন! মহান ইচক দুয়েন্দে টিয়াদুরে সৃষ্টিজগতের এমন এক প্রবণতার বিমূর্ত ও মূর্তের মিশ্র চিত্র গড়েছেন, যা মানুষের কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ করে। মানুষ কেবল অপরাপর প্রাণ-প্রকৃতি হন্তারকই হয়ে ওঠেনি, এমনকি স্বজাতিকেন্দ্রিকতাও বজায় রাখতে পারেনি, লিপ্ত হয়েছে পরস্পরবিরুদ্ধ চিন্তা ও কার্যক্রমের অর্থহীন লড়াইয়ে, যা সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রাণসত্তার বৃহত্তর সম্পর্কজাল বিক্ষত ও ছিন্ন করে। এর বিপরীতে, সর্বপ্রাণবাদের মূল শর্ত হলো, জগতের সকল প্রাণের সমান মর্যাদা স্বীকার ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ আচার-ব্যবহার করা। ‘মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব’ জাতীয় কথায় যে ভঙ্গুর শ্রেষ্ঠত্ববাদ ঘায়ের মতো ফুটে ওঠে, সর্বপ্রাণবাদ তা থেকে মুক্ত। আরেক দিকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার অভিপ্রায়ে রাজনীতি নামক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েই পরিণত হয় স্রেফ ক্ষমতা অর্জন এবং নাগরিক নামক জনসাধারণসহ সকল প্রাণসত্তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের শাসনব্যবস্থায়। এই প্রেক্ষাপটে ‘সর্বপ্রাণবাদী রাজনীতি’ বলতে এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে, যেখানে সকল প্রাণ মহাপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সমান মর্যাদা, স্বার্থ, আনন্দ ও কল্যাণের অধিকারী। এই ধারণাকে এমন এক সাম্য ও সমতাপূর্ণ মানবিক দুনিয়া কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে, যার মাধ্যমে প্রত্যেক ভিন্ন সত্তা নিজ নিজ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ও অধিকারসহ সমমর্যাদায় বিবেচিত হবে। শুনতে, ভাবতে ও দেখতে রূপকথার মতো মনে হলেও টিয়াদুরে প্রতিফলিত এই আইডিয়া আমাকে আচ্ছন্ন করে। এ মহাগপ্পে মানুষের নাম যেমন চিরমা দুর্দিক বা জুলিপান তিন্দভ, বৃক্ষের নাম বোবাডোম—‘বাগানের গাছপালার একটার পর একটা নাম’, এমনকি পোষা বেজির মিষ্টি নাম কুহমি-জুহমি, তেমনি যাদের নাম থাকতে পারে বলে মানুষ ভাবতেই পারে না, সেই সব প্রাণ-প্রজাতিরও আকর্ষণীয় ও অপ্রচলিত নাম রেখেছেন ইচক দুয়েন্দে। এসব নাম উচ্চারণ করতে গেলে রোমাঞ্চ জাগে, কানে মধুর ও দীর্ঘস্থায়ী স্বনন তৈরি করে। মনে হয় যেন এক ইউটোপিয়ান পৃথিবীর নাম-সংস্কৃতির মধ্যে আমি প্রবেশ করি। তবে কেবল নামেই নয়, চরিত্রগুলো চিন্তা ও কার্যকলাপেও অভিনব। যেমন ভাই-অন্তপ্রাণ মেয়ে জরি তাতার ‘বাস বনেবাদাড়ে। বন্য উদ্ভিদ বৃক্ষ সাপখোপ ও প্রাণীর সাথে তাঁর ওঠাবসা।’ ওদিকে অদ্ভুত মানবিক এক চরিত্র ‘টিয়াদুর’: ‘জি, বাদুর ঈয়াক ঈল্ ও টিয়ে পাখি দিনাট নুনঝের ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেন টিয়াদুর।’ হিরণ্ময় চন্দের প্রচ্ছদে এই নতুন অচেনা অথচ যেন কতকালের চেনা এই পাখি প্রজাতিকে দেখাও যায় মহাগপ্পের বইটির মলাটের গায়ে উড়ন্ত ভঙ্গিতে। তার লাল ঠোঁট—গোলাকার, সাদা গোল চোখে গোল কালো মণি, সারা গা সবুজ, হলুদ লেজ, ধূসর পাখনা, গলায় কমলা রঙের অপরূপ রিং লেপ্টে আছে! মনে হয় রং–বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের এক বহুরঙা জীবন্ত মেটাফোর এই টিয়াদুর নামের ক্রস প্রাণিটি। এ পাখির এমন গুণ, যা মানুষের আদর্শে থাকলেও, আচার-আচরণে নেই। পরির মেলা তথা সতের্বাঠার মেলায় বেনজা ইনঝের মতো ‘মরে গেছে’ ধরে নেওয়া সমস্ত মানুষকে পাখায় ঢেকে সুরক্ষা দেয় টিয়াদুর, পুনরায় বাঁচিয়ে তোলে। আরও কত ইঙ্গিতময় ভূমিকাই যে পালন করে টিয়াদুর—পৃথিবীর মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের নতুন পথ প্রদর্শন করতেই হয়তো। ইচকের মহাগপ্পে এই প্রকৃতির এমন সব মাজেজা বর্তমান, যা পাঠককে উদ্দীপিত করে প্রচলিত চিন্তা-কাঠামোর বাইরে গিয়ে জীবন, জগৎ ও জাগতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে নতুন ভাবনার দিকে বাঁক নিতে। ইচক দুয়েন্দে এখানে ব্যর্থ বিধ্বস্ত উপেক্ষিত গ্রেগর সামসার ক্রমে ভয়ংকর পোকায় রূপান্তরিত হবার মর্মস্পর্শী দৃশ্যও নেই। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্মের মতো সম্পূর্ণ পলিটিক্যাল এলিগরিও এটি নয়; যেখানে শুয়োর, হাঁস-মুরগিসহ বিবিধ প্রাণী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; যেখানে হাসতে হাসতে ঘোষণা করা হয়: ‘অল অ্যানিমেলস আর ইকুয়াল বাট সাম অ্যানিমেলস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স!’ টিয়াদুরে সকল প্রাণসত্তা তাদের নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্যে হাজির হয় এবং তাদের কার্যকলাপ সংঘটিত হয় মানুষের দুনিয়ায় একীভূত হবার মধ্য দিয়ে। মাঝেমধ্যে মানুষের জাগতিকতার দিকে ক্রিটিক্যালি তাকালে বমি আসে। কত ভেদ ও বিভেদ মানুষ উদ্ভাবন করেছে অপরকে খাটো করে, তুচ্ছ করে, নিজেকে ও নিজের প্রজাতিকে বা গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ করে তোলার রিপুতাড়িত উদ্দেশ্যে। হিন্দু-মুসলমানে, ইহুদি-খ্রিষ্টানে, ব্রাহ্মণ-নমশুদ্রে, ভিন্ন ভাষাভাষিতে, সাদায়-কালোয়, ধনি-গরিবে, শাসক-শাসিতে, মানুষে-পশুতে-পাখিতে-উদ্ভিদে সম্মিলন পণ্ড করে দিতে অমানবিক, প্রাণ-প্রকৃতি সমন্বয়বিরোধী আইন, বিশ্বাস, নীতি, রীতি ও প্রথা দানবীয় ধারালো তলোয়ারের বেড়ার মতো খাড়া করে রেখেছে মানুষ জাতি। এই পটভূমির ওপর টিয়াদুরে ভিন্নতার মিলনে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক মানবীয় প্রাণী ‘টিয়াদুর’; জন্ম হচ্ছে নতুন ধারণার, নতুন সম্ভাবনার। টিয়াদুর আসলে কৃত্রিম প্রথা, বিশ্বাস ও নিয়মের জালে আটকা পড়া শ্বাসরুদ্ধকর সমাজকে প্রাকৃতিক পৃথিবীর দিকে যাত্রা করার শিল্পিত আহ্বান। এই অভিযাত্রার সহযাত্রীদের কাউকে রূপান্তরিত হতে হয় না, যে যার নিজ অবয়ব, ভাষা ও স্বভাব নিয়েই এগোয়। ইচক জানেন, সাগরের সঙ্গে সংগম করতে নদীর প্রয়োজন পড়ে না সাগরে রূপান্তরিত হবার, বরং নদী যেখানে থামে, সেখানেই সাগরের শুরু। না, ইচকের মহাগপ্পে কোনো হাস্যকর ‘হাঁসজারু’ নেই। এখানে ব্যর্থ বিধ্বস্ত উপেক্ষিত গ্রেগর সামসার ক্রমে ভয়ংকর পোকায় রূপান্তরিত হবার মর্মস্পর্শী দৃশ্যও নেই। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্মের মতো সম্পূর্ণ পলিটিক্যাল এলিগরিও এটি নয়; যেখানে শুয়োর, হাঁস-মুরগিসহ বিবিধ প্রাণী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; যেখানে হাসতে হাসতে ঘোষণা করা হয়: ‘অল অ্যানিমেলস আর ইকুয়াল বাট সাম অ্যানিমেলস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স!’ টিয়াদুরে সকল প্রাণসত্তা তাদের নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্যে হাজির হয় এবং তাদের কার্যকলাপ সংঘটিত হয় মানুষের দুনিয়ায় একীভূত হবার মধ্য দিয়ে। টিয়াদুর পাঠান্তে এই বোধ জন্ম নেয় যে সকলের সমান হবার দরকার নেই। আদতে তা সম্ভবও নয়। ভিন্নতার বৈচিত্র্য দ্বারাই সৃষ্টিজগতের বাস্তবতা ও অনুপম সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। যে যার অবস্থা ও অবস্থানে থেকেই ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সসম্মানে চিহ্নিত হয়। অসম চেহারা, আলাদা সক্ষমতা (কেউ উড়তে পারে, কেউ পারে ভাসতে, কেউ দৌড়াতে) নিয়েই প্রত্যেক সত্তা যার যার ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে সহাবস্থান করতে পারে। কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ ২০২১ সালের কোনো এক ঘোর লাগা শীতের সন্ধ্যায় ইচক দুয়েন্দের এই মহাগপ্পের খবর ঘোষণা করেন। কী তাঁর উত্তেজনা!