সারকথা প্রবন্ধটি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট, ঐতিহাসিক বিবর্তন ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। আধুনিক জিনতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের জেনেটিক ভিত্তি সম্পূর্ণ অভিন্ন এবং মুসলিমদের সরাসরি বিদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার ঐতিহাসিক দাবিটি অবৈজ্ঞানিক। ঐতিহাসিকভাবে 'আশরাফ' বা অভিজাত শ্রেণির সামাজিক অবজ্ঞা ও বঞ্চনা থেকে বাঁচতে সাধারণ 'আতরাফ' বা নিম্নবর্গের বাঙালি মুসলিমরা একধরনের সুপরিকল্পিত 'বিস্মৃতির রাজনীতি' বা কালচারাল অ্যামনেসিয়ার আশ্রয় নেয়। নিজেদের স্থানীয় পূর্বপুরুষের নাম ও পেশাগত পদবি সজ্ঞানে মুছে ফেলে তারা 'শেখ' পদবি গ্রহণ বা নামের শুরুতে 'মোহাম্মদ' যুক্ত করার মাধ্যমে একটি কাল্পনিক আভিজাত্য ও বৃহত্তর বৈশ্বিক ইসলামি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে, যা বর্তমানে তাদের নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে ফেলছে। প্রবন্ধটিতে আরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সংস্কৃতি এবং পরবর্তীকালে ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' বনাম ধর্ম ও ভূখণ্ডভিত্তিক 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এই পরিচয়ের সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। পরিশেষে লেখক একটি 'উত্তর-জাতীয়তাবাদী' রাষ্ট্রকল্পের প্রস্তাব করেছেন, যেখানে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তিনি মনে করেন, নিজেদের প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক শিকড় ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার না করে, বরং তা সগৌরবে স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমেই বাঙালি মুসলিম সমাজের এই দীর্ঘস্থায়ী আত্মপরিচয়-সংকটের অবসান এবং একটি সাম্যবাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ সমাজ গঠন করা সম্ভব। ভূমিকা শ্রেণিকক্ষে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস নির্মাণের রাজনীতির আলাপে একটি বিষয় প্রায়ই জানতে চাই—কে কে তাঁর ‘দাদার–বাবার নাম জানেন’। এর জবাবে ৩০ থেকে ৪০ জনের ভেতরে ৫ থেকে ৭ জন জানেন বলে হাত উত্তোলন করেন। তার মানে সিংহভাগই জানেন না। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় হলে প্রশ্নকর্তা হিসেবে আমি নিজেসহ সিংহভাগই দাদার–বাবার নাম জানি না। এখন প্রশ্ন হলো, এই না জানাটা কি একটি সাধারণ বিস্মৃতি, নাকি রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া? যদিও ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর ১৮৮২ সালের ‘হোয়াট ইজ আ নেশন’ নামক বিখ্যাত বক্তৃতায় প্রথম এই রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া বা ভুলে যাওয়ার প্রকল্পের বীজ বপন করেন। তাঁর মতে, জাতি গঠনের জন্য অতীতকে নিখুঁতভাবে স্মরণ রাখার চেয়ে অতীতকে ভুলে যাওয়া বেশি জরুরি। বিশেষত, প্রাচীনকালের জাতিগত সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিভেদকে ভুলে গিয়েই একটি সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় (রেনান ১৮৮২: ৫১-৬০)। অর্থাৎ সংঘাতময় বাস্তব অতীতের ‘অনুপস্থিতি’ বা সেটিকে যৌথ স্মৃতি থেকে মুছে ফেলাই আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রধান শর্ত। এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে যে পরিচয়ের উত্তরাধিকারকে ভুলে যাওয়া জরুরি কি না? অথবা জাতীয়তাবাদের হাত ধরে একমুখী পরিচয় নির্মাণও কতটা ভয়াবহ হতে পারে?