ভার্চ্যুয়াল জগৎ মাঝেমধ্যে আমাদের চেনা সমাজের ওপর এমন এক ল্যাবরেটরি টেস্ট চালায়, যার ফলাফল দেখে শিউরে উঠতে হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ঘটে যাওয়া ‘হালালা সেন্টার’ নামক একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা আমাদের তেমন এক নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। একটি ভুয়া আইডি থেকে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের পুনরায় আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার ‘সুবিধার্থে’ ‘হিল্লা’ বিয়ে করার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। পরবর্তী পোস্টে জানা যায়, এ ‘প্রস্তাবে’ সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজার পুরুষ ই-মেইলে নিজেদের সিভি পাঠিয়েছেন। বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে কারও অভিযোগের ভিত্তিতে ‘পুলিশ ডেকেছে’—এমন ক্ষোভ থেকে ‘গোপন রাখার শর্তে’ পাঠানো সিভিগুলোর মধ্য থেকে ৮০টি ই–মেইলের স্ক্রিনশট ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়া হয়। এ তালিকায় যেমন আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী; তেমনই আছেন হাফেজ, আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসাশিক্ষক, মাদ্রাসা পরিচালক। দুঃখের কথা হলো, প্রকাশিত ছবিগুলোর বড় অংশ ধর্মীয় লেবাসের মানুষ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আইডি পরিচালনাকারী স্বীকার করেন, ‘পুরো প্রতিষ্ঠানটি ছিল কাল্পনিক, তবে ফাঁস হওয়া সিভির একটিও ভুয়া ছিল না।’ মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাঁদের অনেকে দাবি করছেন যে তাঁদের জিমেইল হ্যাকড হয়েছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ‘মজার ছলে’ দুষ্টামি করতে গিয়ে তাঁরা এই ফাঁদে পড়েছেন। এটি সত্যি হলে, তা আরও ভয়াবহ বিপদের কথা বলে। সাইবার অপরাধের এই যুগে যে কারও ছবি বা জীবনবৃত্তান্ত ব্যবহার করে তাঁকে এভাবে ব্ল্যাকমেল বা সামাজিক ফাঁদে ফেলা সম্ভব। তবে যাঁরা জেনেশুনে, সজ্ঞানে এমন ‘কুৎসিত’ উদ্দেশ্যে নিজেদের তথ্য পাঠিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক লজ্জাকে বলা যায় তাঁদের নিজেদের কর্মের ফল। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের আড়ালে যে সত্য ঢাকা পড়ে যায়, তা হলো একজন নারীকে সাময়িকভাবে বিয়ে করে ‘উপভোগের পর মর্জিমতো ছেড়ে দেওয়া বৈধ অধিকার’ রয়েছে—এমন একটি কদর্য সুযোগ লুফে নিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিশেষ করে ধর্মীয় ভাবধারার মানুষের ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে এখানে। সুস্থ সামাজিক কাঠামোর জন্য এটি বড় ধরনের সংকেত। বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধনকে যারা চুক্তির পণ্যে পরিণত করতে উদ্গ্রীব, তারা আমাদের চারপাশের চেনা মানুষই। এ ঘটনাকে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে দেখলে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতার তত্ত্বটি মনে পড়ে। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজে যখন দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন একধরনের নিয়মহীনতা বা শূন্যতা তৈরি হয়। সেখানে তখন মানুষ যেকোনো উপায়ে নিজের আদিম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার সুযোগ খোঁজে। তা ছাড়া এখানে নারীকে অবলীলায় প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার ‘উপায়’ হিসেবেও মানুষকে ব্যবহার করার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, মানুষকে কখনো অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের ‘উপায়’ বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; প্রত্যেক মানুষ নিজেই একেকটি লক্ষ্য। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে কেন এমন একটি গরল দেখা গেল? যে সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটছে, ধর্মীয় আলোচনা হচ্ছে, সেই সমাজের আলেম, হাফেজ বা ইমামদের একটা অংশ কীভাবে এমন একটি জঘন্য ফাঁদে পা দিতে পারে? তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ঢাল বানিয়ে ‘হালালা সেন্টার’ খোলা, ‘দ্বীনে ফেরা’ মডেল কর্তৃক ম্যারেজ মিডিয়ার মতো অদ্ভুত উদ্যোগ নেওয়া কিংবা ‘মাসনা কলোনি’ নামক বহুবিবাহের আবাসিক ভবনের ঘোষণা দেওয়া—এসবই হলো সমাজে কোনো একক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার এবং যথেচ্ছ ব্যাখ্যার সংকট। উত্তরে অনেকে বলবেন, এর প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষার আত্মিক দিকটিকে বাদ দিয়ে কেবল ‘আইনি চতুরতা’র মানসিকতা। কেউ আরও গভীরে দর্শন দেবেন, ধর্ম যখন মানুষের ভেতরের নৈতিকতাকে পরিশুদ্ধ না করে শুধু বাহ্যিক লেবাস আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্ম হয়। ধর্ম তখন হয় কিছু অন্তঃসারশূন্য বিধিনিষেধের যোগফল। ফলে একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ও বহন করতে পারে আবার ‘উপভোগ করে ছেড়ে দেওয়ার’ লোভে সিভিও পাঠাতে পারে। এটি ধর্মের ত্রুটি নয়; বরং ধর্মকে আপন স্বার্থে ব্যবহার করার বিকৃত মনস্তত্ত্ব। আমার কাছে কারণটি অন্য রকম। আমাদের এই চেনা ধর্মীয় সমাজের অবয়ব বা আয়তন দিন দিন বাড়ছে, তারা সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িতও হচ্ছে, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মীয় সুশাসন পরিচালনার কোনো একক ‘অথরিটি’ বা অভিভাবকত্ব তৈরি হয়নি অথবা বলতে হয় অভিভাবকত্বের ছড়াছড়ি। দেশের ধর্মীয় শ্রেণিই ধর্মের যুক্তিকে কেন্দ্র করে এত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। কওমি সনদের স্বীকৃতি, রাজনীতি ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ এ অঞ্চলে আত্মশুদ্ধি শেখার অন্যতম বড় একটি মিশনারি সংগঠন হলো তাবলিগ, অথচ আজ তাদের মধ্যেও তীব্র বিভাজন। রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থীদের বিভাজিত দলের সংখ্যা অনেকের মতে শতাধিক। শিক্ষাধারায়ও ঢুকে পড়েছে হাজারো বিভক্তি; দেশে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজারো ‘প্রাইভেট’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এত বিপুল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একেকটি গ্রুপ এখন অন্ধের মতো যে যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে আর একশ্রেণি নিজেদের অন্যায় স্বার্থে তা লুফেও নিচ্ছে। আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হলো ধর্মীয় সমাজের একাংশের তীব্র আর্থিক দৈন্য। বিশেষ করে লাখো মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ শিক্ষিত বেকারশ্রেণিও দিশাহারা। এই বিপুল কর্মহীন পুরুষের একটি বড় অংশ ধর্মের মোড়কে তৈরি হওয়া নানা ফন্দিফিকিরে পা দিচ্ছেন। কারণ, ইদানীং আমরা প্রায়ই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠা চটকদার ‘ব্যবসায়িক প্রকল্প’ বা উদ্যোগের উদ্বোধন দেখতে পাচ্ছি। নিখোঁজ সংবাদ: মাদ্রাসার শিশু–কিশোরের সংখ্যা কেন বেশি দেখা যায়, কাল্পনিক হালালা সেন্টারে যাঁরা সিভি পাঠিয়েছেন, তাঁদের অনেকে ই-মেইলে সরাসরি আর্থিক বিষয়টি সামনে এনেছেন। কেউ অবলীলায় লিখেছেন, তিনি তালাকপ্রাপ্ত নারীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, তবে তিনি নিজে গরিব; তাই তাঁর ‘আর্থিক সুবিধার’ বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়!