যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে পড়ে থাকা লাশের মতো জামাকাপড়, বিছানার চাদর, বই—একটার পর একটা এত দিন ধরে রুদ্রর ঘরে পড়ে ছিল। গ্লাস আর ভাত খাওয়ার প্লেটে দুধের বলকের মতো জমে ছিল সাদা আস্তরণ। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এই পরিবেশে বসবাস করা কঠিন। কিন্তু নব নবরূপে গ্রীষ্মে যেমন কৃষ্ণচূড়ার আগমন ঘটে, তেমনি ঢাকা শহরেও প্রতিদিন পাড়ি জমায় অগণিত নতুন মানুষ। তাদের কাউকে কাউকে পরিস্থিতির কারণে কিংবা নিয়তির বিধানে অসম্ভব জেনেও এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে হয়। বিশেষ করে তিন শ্রেণির—যাদের কেউ অভাবের তাড়নায় কাজ করে পেট চালানোর আশায় ঢাকায় আসে; দ্বিতীয় শ্রেণি হলো তারা, যারা থাকা–খাওয়ার ভার না নিয়ে কেবল স্বপ্নপূরণের তাগিদে পাড়ি জমায়। আর তৃতীয় শ্রেণির কারও কারও গল্পটা এমন যে চাহিদা বা উপযোগিতার ধরনে নয়, বরং জীবন বেদনাময় বিষম ব্যথায়। ‘ঢাকা শহরকে স্বপ্নপূরণের সূতিকাগার বললে কি ভুল হবে?’ প্রশ্নটা রুদ্রর। মাঝেমধ্যে বিষয়টা নিয়ে ভাবে। বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষকতা কিংবা হোক তা সর্বনিম্ন পদের কোনো চাকরি, ঢাকা শহরে পা না দিয়ে কিছুই জোটানো যায় না। অনেক অসম্ভব, অপমান, অপারগতা হাসিমুখে মেনে নিতে হয়। রুদ্রও স্বপ্নপূরণের তাগিদেই পাড়ি জমিয়েছে ঢাকায়। তবে তার অবস্থা চাহিদা বা উপযোগিতার ধরনে দুঃসহ নয়। চাকরির প্রস্তাব হাতে নিয়েই ঢাকায় ঢোকে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছে; কিন্তু করলে কী হবে, থাকার জায়গা আর কর্মস্থল ব্যতীত কিছু চেনে না সে। মেট্রোতে করে কাজের জায়গায় রোজ যায়, আবার মেট্রোতে চেপেই বাসায় ফেরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে নতুন মানুষের সঙ্গে তুলনা করা অনুচিত হবে না। শ্রেণিবিভাজনের দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়বে রুদ্র। তার বুক ভরে আছে বিষম ব্যথায়। ব্যথাটা কী? গ্রাম, উপজেলা শহর, জেলা শহর আর রাজধানী শহরের জীবনাচরণে অনেক পার্থক্য। জীবনের গতিশীলতায়ও আছে ভিন্নতা। আবেগ, সহানুভূতি, ভালোবাসা প্রকাশের ধরনও আলাদা আলাদা। কে ভালোবাসে, কে শুভাকাঙ্ক্ষী, কে ব্যবহার করতে চায়, কে সুযোগ নিতে চায়—বোঝা মোটেও সহজ নয়। রুদ্র গ্রামের ছেলে। নদী-জলে সাঁতরে, বৃষ্টিভেজা মাঠে দৌড়ে বড় হয়েছে। বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরের মতো দিলখোলা তার হৃদয়। বিনয়ী, নম্র, ভদ্র; সহজে মুগ্ধ হয়, ভালোবাসে, অভিমান জমায়। যদিও জেলা শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে, কিন্তু চোখ–কান সেই অর্থে ফোটেনি। তবে পরিসংখ্যানে স্নাতক করার সুবাদে তার পর্যবেক্ষণক্ষমতা ভালো। রুদ্র কাজ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। চৌত্রিশ হাজার তিন শ পঞ্চাশ টাকা বেতন পায়। বাড়িতে টাকা পাঠানো লাগে না। মধ্যবিত্ত পরিবার হলেও বাবার উপার্জনে চলে যায়। প্রতি মাসে উপরন্তু বাবা রুদ্রকে টাকা পাঠাতে চান। স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের মতো রুদ্রর জীবনও স্বাভাবিকভাবে চলছিল। ঘরের বসবাস–অনুপযোগী এই অবস্থা আগে ছিল না। রুদ্র পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। সব সময় ঘর পরিপাটি আর বিছানা স্বচ্ছ জলের মতো পরিষ্কার থাকত। কিন্তু নক্ষত্রপতনের মতো হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে। এই ছন্দপতনে রুদ্রর কোনো হাত ছিল না। জীবনে কিছু ঘটনা অতি অকস্মাৎ ঘটে যায়, মানুষের কিছু করার থাকে না। রুদ্র সেদিন যেতে চায়নি। মাথাব্যথা করছিল। তা ছাড়া বই পড়তে পছন্দ করে না সে। অনেকবার বলেছিল, ‘যাব না, স্যার। মাথাব্যথা করছে, আপনি যান।’ কিন্তু শফিক সাহেব নাছোড়বান্দা। জোর করেই লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন রুদ্রকে। গাড়িতে উঠে মাথাব্যথার জন্য বিরক্ত লাগলেও কারওয়ান বাজার পার হয়ে বাংলামোটর থেকে শাহবাগে যেতে ডান হাতে সান টওয়ারের নিচতলার ‘দ্য ড্রিম লাইব্রেরি’র সামনে গাড়ি থামতেই রুদ্রর মাথাব্যথা যেমন উবে যায়, মনও ভালো হয়ে যায়। লাইব্রেরিটা বড় সুন্দর, মনোরম। নামের সঙ্গে যদিও কফিশপের উল্লেখ নেই, কিন্তু বইয়ের চেয়ে কফিই বেশি বিক্রি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা কয়েকজন তরুণী লাইব্রেরিটির উদ্যোক্তা। রুদ্র পেছনে ঘুরে তাকায়। পবিত্র আলোকরশ্মির মতো একটা ঘোর এসে লাগে চোখে। সে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তরুণীর পরনে সাদা সালোয়ার–কামিজ, বুকের ওপর সাদা ওড়না বিছানো। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলছে। ‘মৃদুলা বিশ্বাস, এক্সিকিউটিভ, দ্য ড্রিম লাইব্রেরি।’ হাতে সোনা রঙের ব্রেসলেট ঘড়ি। চোখ দুটো করমচা ফলের মতো গোটা গোটা। ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। কপালে শর্ষেদানার মতো ছোট কালো টিপ। রজনীগন্ধা ফুলের সুবাস ভেসে আসছে চুল থেকে। চুলগুলো কাশবনের মতো পিঠের ওপর বিছানো। শফিক সাহেব ঘুরে ঘুরে মেয়ের জন্যে ‘শার্লক হোমস’ ও সেবা প্রকাশনীর বই খুঁজছিলেন। রুদ্রও হাঁটছিল পেছন পেছন। সাহিত্যের প্রতি রুদ্রর আগ্রহ নেই। কবি শঙ্খ ঘোষ যে বছর মারা গেলেন, সেবার বিসিএসে একটা প্রশ্ন এসেছিল। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কাব্যগ্রন্থের কবি কে? রুদ্র তখন চতুর্থ বর্ষে পড়ে। কাব্যগ্রন্থের নামটা ভালো লাগায় গুগলে সার্চ করেছিল। কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে পেয়েছিল কাব্যগ্রন্থের নামকবিতাটাও। কয়েকবার কবিতাটা পড়ে মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে মুখস্থ হয়ে যায়। সাহিত্যের প্রতি স্বতঃপ্রণোদিত ভালো লাগা বলতে রুদ্রর জীবনে এটুকুই। এর বাইরের যা, তা করেছে বাধ্য হয়ে। যেমন কলেজে থাকতে একাডেমিক চাপে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো কখনো বন্ধুদের জোরাজুরিতে। শফিক সাহেবের সঙ্গে লাইব্রেরিতে হাঁটতে হাঁটতে শঙ্খ ঘোষের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ বইটা চোখে পড়ে রুদ্রর। তাক থেকে বইটা হাতে টেনে নেয়। ‘কী কবিতা পড়ো?