আড্ডাঘরের কোণে রাখা পুরোনো লণ্ঠনটা মাঝে মাঝেই একটু কেঁপে উঠছে। তেলের অভাব নাকি বাতাসের ঝাপটা, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমরা জনা সাতেক মানুষ আষ্টেপৃষ্ঠে গোল হয়ে বসে আছি। বাইরের অন্ধকারটা আজ বড্ড বেশি জমাট। কেউ একজন দেশলাই জ্বালিয়ে ধরাল, সেই এক মুহূর্তের আলোয় দেখলাম সবার চোখ আমার দিকে। কারণ, এবার আমার গল্পের পালা। আমি গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিলাম। আজ কোনো হালকা চালের গল্প নয়, আজ এক গভীর ক্ষত আর একটা অদ্ভুত উন্মাদনার গল্প শোনাব। শোনো তবে। সেই সীমান্তরেখার গল্প। জায়গাটা এমন যে ম্যাপে দেখলে মনে হবে একটা সরু পেনসিলের আঁচড়। কিন্তু বাস্তবে ওটা একটা অনন্ত নরক। মাইলের পর মাইল কাঁটাতার। একদিকে ধূসর পাহাড়, অন্যদিকে শুকনো পাথুরে জমি। সেই মাঝখানের শূন্যরেখায় দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। তারা মানুষ নাকি প্রস্তরীভূত কোনো মূর্তি, তা দূর থেকে বোঝা দায়। তাদের পরনে ভারী উর্দি, হাতে ধরা স্টেনগান। সেই গান-ব্যারেলের নল একে অপরের হৃৎপিণ্ড বরাবর স্থির। আজ না, কাল না—বহু যুগ ধরে তারা এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য পলক পড়ে না, এক ইঞ্চি নড়ে না। আচ্ছা, তারা কি কখনো ক্লান্ত হয় না? ওদের কি মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষটার নাম জানতে ইচ্ছা হয় না, গল্প শুনতে ইচ্ছা করে না সীমান্তের ওই পাড়ের? তপন জিজ্ঞেস করল। ওর গলার স্বরটা আজ খানিকটা রুক্ষ। আমি নীরস জবাব দিলাম—ক্লান্তি?