এক ছিল বাবা। বাবা ছিল বোকা। বাবার বিত্তসম্পদ তেমন কিছু ছিল না। তবে চিত্তে ছিল তাঁর অফুরন্ত আনন্দ, অহমিকা-ঈর্ষা, ক্রোধ-বিরক্তি তাঁর ছিল অজানা। বেশ কটি সন্তানাদি ছিল বাবার। তবে গর্ব করে বলার মতো তেমন বিষয় এটা নয়। সেই সময়ে ওই রকম সন্তান সব বাবাদেরই থাকত। সন্তানসংখ্যা এক জোড়া, এক হালি কদাচিৎ দেখা যেত। বাড়ি বাড়ি আধা ডজন, এক ডজন ছেলেমেয়ের ছড়াছড়ি। তো বাবারও নিজের ছিল আধা ডজনের বেশি ছেলেপিলে, আর মাঝেমধ্যেই থাকত এসে বাবার ভাগিনা, ভাইপো আর ভাইজি। আরও কত আত্মীয়–অনাত্মীয়। বাবার বাড়িতে কেউ এলেই তাকে আরাম-আয়েস, স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া যেত না তেমন, তবে আন্তরিকতা ও স্বস্তি মিলত পরিমাণে একটু বেশিই। বিশেষ করে বাবার দিক থেকে। এসব ফালতু আন্তরিক আচরণের জন্য বাবার সুনাম কেউ করত না। উল্টো বরং বাবার সচ্ছল বন্ধুরা ও গোছানো পরিপাটি জীবন যাপনকারী ভাইবোনেরা ঠাট্টা–তামাশা করত বাবাকে নিয়ে। কেউ কেউ রুক্ষভাবে তাচ্ছিল্য ভরে বলত ‘নিজের নাই ঠাঁই, শংকরাকে ডাক’। কেউ ঢাকায় চাকরি খুঁজতে এসে আশ্রয় নিত, কেউ ডাক্তার দেখাতে এসে উঠত। একবার এক অনাত্মীয় ভবঘুরে গ্রাম থেকে ঘুরতে ঘুরতে ঢাকায় বাবার কাছে এসে আব্দার জুড়ল। ‘আমাকে একটা দপ্তরির চাকরি দেন, চাকরি পেয়ে গেলে ঘোরাঘুরি বাদ দেব, বিয়ে করব, ঘরসংসার পাতব মামা’ ‘তুই তো নামও সই করতে পারিস না, কি চাকরি করবি অ্যাঁ!’ ‘কথাটা ঠিক; বেতন তুলতে গেলে নাম সইতো করতে হবে, সই আপনি শিখিয়ে দেন মামা, আপনার স্কুলেই দপ্তরির চাকরিটা দেন।’ কথা শেষ করেই ঘুরাঘুরিতে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ভবঘুরেটি সামনে থালা ভর্তি ভাত চেটেপুটে খেয়ে সিমেন্টের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। দুই দিন বাবার অনাত্মীয় আপনজন ভবঘুরেটি বাবার সঙ্গে লাফিয়ে–ঝাঁপিয়ে বাজারে গেল। সওদাপাতি কিনে ছালা বোঝাই করে রিকশায় তুলে ফিরল। ‘চাকরি না হলেও চলবে, রিকশা জোগার করে দেন রিকশা চালাব। এই কাজে তো নামসই লাগবে না ’ ‘রিকশা চালাতে পারিস?’ উদাস ভঙ্গিতে পাতানো ভবঘুরে ভাগিনা উত্তর দিল ‘রিকশা তো দূরের কথা, জীবনে কোনো দিন সাইকেলে হাত দেওয়ার সুযোগ হয় নাই মামা ’ ‘তাইলে?’ পরদিন বাবার এক বোন আসবেন নরসিংদী না নারায়ণগঞ্জ থেকে। এখানে দুপুরে খেয়ে বিকালের মধ্যেই পাবনা না যশোর রওয়ানা দেবেন। বাবার কাজে ব্যস্ততা তাই সকালে মা–বাবার হাতে মুরগি, কলিজা, পোলাওয়ের চাল ও ঘি আনার জন্য পয়সা দিয়ে বললেন ভবঘুরেকে বাজারে পাঠাতে। ভবঘুরে তখন বলল, ‘একটা টুকরি কিনতে পারলে সওদাগুলো আনতে সুবিধা হতো আর পরে ওই টুকরিটা নিয়ে বাজারে মোট বওয়ার কাজ করতে বসে যাব, রোজগারপাতি কিছু হবে’। ভবঘুরের কর্মস্পৃহা দেখে বোকা বাবা বিস্মিত। প্রথমে দপ্তরি তারপরে রিকশাওয়ালা, এবার সে মোট বইতেও রাজি! বাবা রীতিমতো মুগ্ধ। মাকে বললেন, ‘আমার কাছে আর পয়সা নাই, তুমি পারলে ওই ছোড়াকে টুকরি কেনার পয়সা দিও, আমি পরে দিয়ে দেব’। ভবঘুরেকে বাজারে পাঠিয়ে মা এদিকে আদা-পেঁয়াজ-রসুন বাঁটিয়ে রাখলেন। মেহমানকে মাছ ও ভালো কোনো সবজি দেওয়ার কথা ভাবলেন মা। ভবঘুরে ততক্ষণে চলে গেছে বাজারে। ঘরে কাঁচকলা ছিল তাই দিয়ে সুরাঁধুনী মা মজাদার টিকিয়া ভেজে ফেললেন। সময় যাচ্ছে বাজার আর আসে না। বাবার বোন আসার সময় ঘনিয়ে আসছে। উপায় কী এখন। আবার কাউকে বাজারে পাঠাবেন, সেই পয়সা ও সময় কোনোটাই নাই। মা নিরুপায় হয়ে পাশের বাড়ির প্রতিবেশি আপাকে সমস্যাটা বললেন। তখনকার সময়ে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ছিল অসাধারণ। একজন আরেকজনকে সহজেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। মায়ের কথা শুনেই ওই মহিলা বললেন, ‘চিন্তার কারণ নাই। আমার রান্না হয়ে গেছে আমি আপনার মেহমানের জন্য খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি;’ দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com লাজুক হেসে যোগ করলেন, ‘আমারও আজ ভালো কিছু পদ রান্না হয়েছে।’ পাশের বাড়ির আপা বাটিতে করে থরে থরে সযত্নে সাজিয়ে মেহমানের জন্য সব পদ পাঠালেন। ভাত, ইলিশ মাছের পাতুরী আর খাসির কালিয়া। এদিকে বাবার বোন একটু দেরিতে পৌঁছলেন। তাড়াহুড়া করে খেয়েই বের হতে হবে তাকে। সময় কম। উনি জিজ্ঞাসাও করলেন না যে তোমরা খাবে কি না। বা উনি হয়তো ভেবেছেন এই বাড়ির সবার এতক্ষণে নিশ্চয় খাওয়াদাওয়া শেষ। নামীদামি দোকানের বেশ বড়সড় এক হাড়ি মিষ্টি ও বিশাল এক নিমকির ঠোঙ্গা বাচ্চাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাবার বোন বিদায় নিলেন। সেই দিন বাড়ির ক্ষুধার্ত বাচ্চাগুলো মহা ফূর্তিতে ফুফুর আনা নিমকি ও মিষ্টি দিয়ে পেটপূর্তি করল। মা অনেক নিমকি ও মিষ্টি পাশের বাড়ি পাঠালেন। বাবা ফিরলে সবাই একসঙ্গে খেতে বসল। আলু ভাজি, ডাল চচ্চড়ি, কাঁচকলার টিকিয়া আর পাশের বাড়ির অল্প খাসির কালিয়া। বাবা জানতে চাইলেন ‘কলিজা, মুরগি কিছুই আনেনি?’ ‘কে আনবে? সেই আলসের বাদশাহ ভবঘুরে নিজেই ফিরে আসেনি’ ‘বল কী!’ ‘যত সব আলতুফালতু মানুষের জন্য দরদ!