বদর যুদ্ধের অন্যতম একটি বিস্ময়কর ও অলৌকিক দিক ছিল স্বপ্ন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, রণকৌশল ও জয়-পরাজয়ের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক জগতের যার গভীর প্রভাব ছিল। যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে এবং যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিম ও মুশরিক উভয় শিবিরে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখা গিয়েছিল। এই স্বপ্নগুলো একদিকে মুসলমানদের ইমানি শক্তিকে দৃঢ় করেছিল এবং অন্যদিকে কোরাইশদের মনে পরাজয়ের আগাম ভীতি সৃষ্টি করেছিল। (আব্দুল মুইন মুহাম্মদ আত-তালফাহ, আহলামু গাজওয়াতি বদর: আনওয়াউহা ওয়া আকাতিফুহা, মাজাল্লাতুশ শারিয়াহ ওয়াল উলুমিল আরাবিয়্যাহ, ভলিউম: ২, পৃষ্ঠা: ১২, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, ২০০৮) ইসলামে স্বপ্নের অবস্থান ও প্রকারভেদ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ওহির সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজির ওহির সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা সকালের সূর্যের আলোর মতো বাস্তব হয়ে প্রকাশ পেত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩) হাদিসে স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “একজন মুসলিমের সত্য স্বপ্ন হলো নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৮৯) সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৮৯ একজন মুসলিমের সত্য স্বপ্ন হলো নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। তিনি স্বপ্নের প্রকারভেদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “স্বপ্ন তিন প্রকার; প্রথমত: শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন বা দুঃস্বপ্ন যা মানুষকে চিন্তিত করে, দ্বিতীয়ত: জাগ্রত অবস্থায় মানুষ যা চিন্তা করে ঘুমের মধ্যে তারই প্রতিফলন (অবচেতন মনের ভাবনা), এবং তৃতীয়ত: নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ সত্য স্বপ্ন যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বহন করে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৯০৭) বদর যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই তিন প্রকারের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয় প্রকারের স্বপ্নের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা দেখতে পাওয়া যায়। মুশরিক শিবিরের স্বপ্ন বদর যুদ্ধে শুধু মুসলিমরা নয়, বরং মক্কার কাফের কোরাইশদের অনেকেও যুদ্ধ শুরুর আগে ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখেছিলেন। এগুলো মূলত ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সতর্কবার্তা, যাতে তারা যুদ্ধ থেকে বিরত হয়। কিন্তু অহংকার ও আবু জেহেলের হঠকারিতা তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বদরের রণকৌশল এবং হজরত আয়েশা (রা.)–এর বিদায় ১. আতিকা বিনতে আব্দুল মুত্তালিবের স্বপ্ন: যুদ্ধ শুরুর তিন দিন আগে মক্কায় অবস্থানকালে নবীজির ফুফু আতিকা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব একটি অত্যন্ত ভয়ানক স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখলেন, এক উটআরোহী ব্যক্তি মক্কার উপত্যকায় এসে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলছে, ‘হে কাবার বিশ্বাসভঙ্গকারীর দল, তিন দিনের মধ্যে নিজেদের ধ্বংসক্ষেত্রের দিকে বের হয়ে এসো।’ এরপর সেই আরোহী কাবার ছাদ এবং আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়ায় উঠে একই আহ্বান জানায়। এরপর সে পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি বিশাল পাথর ছুড়ে মারল। পাথরটি পাহাড়ের পাদদেশে এসে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং মক্কার এমন কোনো ঘর বা অট্টালিকা বাকি রইল না, যার ভেতর সেই পাথরের কণা বা টুকরো প্রবেশ করেনি। (বাইহাকি, দালায়েলুন নবুয়ত , দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ৩/৩১, বৈরুত, ১৯৮৪) আতিকার এই স্বপ্নটি ছিল রূপক বা প্রতীকী। পাহাড় থেকে পাথর ভেঙে মক্কার প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করার অর্থ ছিল—এই যুদ্ধের করাল গ্রাস মক্কার প্রতিটি পরিবারে পৌঁছাবে। উদ্দেশ্য ছিল কোরাইশদের অহংকারে আঘাত করা এবং তাদের আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া। কিন্তু আবু জেহেল এই স্বপ্ন শুনে উপহাস করে বলেছিল, “আব্দুল মুত্তালিবের বংশে পুরুষ নবীদের পর এখন নারী নবীর জন্ম হয়েছে!” (আব্দুল মালিক ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ , ১/৬০৭, দারু মুস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫) কাফেরদের প্রধান প্রধান নেতাদের নাম ধরে ধরে তাদের মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া ছিল সম্পূর্ণ স্পষ্ট বিষয়; আর রক্ত ছিটকে পড়া ছিল যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক। উদ্দেশ্য ছিল কোরাইশদের যাত্রা থামানোর শেষ সুযোগ দেওয়া। ২. জুহাইম ইবনে সালতের স্বপ্ন : কোরাইশ বাহিনী মক্কা থেকে বের হয়ে বদরের অভিমুখে ‘জুহফাহ’ নামক স্থানে পৌঁছাল। এ সময় জুহাইম ইবনে সালত ঘুমের ঘোরে এক অলৌকিক দৃশ্য দেখলেন। দেখলেন, এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে এসে ঘোষণা করছে, ‘উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবু হাকাম (আবু জেহেল) এবং উমাইয়া ইবনে খালাফ নিহত হয়েছে।’ এরপর সে তার উটের ঘাড়ে আঘাত করল এবং সেই উটের রক্ত কোরাইশ বাহিনীর প্রতিটি তাঁবুর ওপর গিয়ে ছিটকে পড়ল। (ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ ফি মা’রিফাতিস সাহাবাহ , ১/৫৭৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৪) জুহাইমের এই স্বপ্নটি ছিল একই সঙ্গে স্পষ্ট এবং প্রতীকী। কাফেরদের প্রধান প্রধান নেতাদের নাম ধরে ধরে তাদের মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া ছিল সম্পূর্ণ স্পষ্ট বিষয়; আর রক্ত ছিটকে পড়া ছিল যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক। উদ্দেশ্য ছিল কোরাইশদের যাত্রা থামানোর শেষ সুযোগ দেওয়া। কিন্তু আবু জেহেল এবারও অহংকার করে বলল, “মদিনার মুহাম্মদের পর এখন কোরাইশদের মধ্যেও নতুন নবীর আবির্ভাব ঘটছে। আগামীকালই দেখা যাবে কে নিহত হয়।” (আব্দুল মালিক ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ , ১/৬১৮, কায়রো, ১৯৫৫) নবীজির স্বপ্ন ও মুমিনদের জন্য সুসংবাদ মুশরিকদের স্বপ্নের বিপরীতে মহানবী (সা.) বদরের ময়দানে যে স্বপ্নগুলো দেখেছিলেন, তার সবকটিই ছিল স্পষ্ট এবং তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুমিনদের অন্তরে স্থিরতা দান এবং বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান। বদর যুদ্ধের ইতিহাস: বদর যুদ্ধক্ষেত্রে একটি দিন ১.