আমরা কি শুধু মানুষের জন্য বাজেট করছি, নাকি মানুষের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশলও তৈরি করছি? এবারের জাতীয় বাজেট পড়তে গিয়ে আমার মনে সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খেয়েছে এই প্রশ্ন। বাজেটে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও জনশক্তি বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করাই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ কি একটি সমন্বিত জাতীয় মানবসম্পদ কৌশলের অংশ, নাকি আলাদা আলাদা কর্মসূচির সমষ্টি? আজকের বিশ্বে দেশগুলোর প্রতিযোগিতা আর শুধু অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একসময় মনে করা হতো, যে দেশ বেশি সেতু, মহাসড়ক বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে, সেই দেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে। বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আজ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সামর্থ্যের ওপর। এ বাস্তবতায় এবারের বাজেটকে শুধু একটি আর্থিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কোন দিকে যেতে চায়, তারও একটি ইঙ্গিত। বাজেটে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, এআই, ফ্রিল্যান্সিং ও বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর বিষয়ে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে বছরে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে আরও আট লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা, ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, দক্ষতা যাচাই কর্মসূচি ও স্মার্ট স্কিল ব্যাংকের মতো উদ্যোগগুলো একই বার্তা বহন করে। নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: ns@prothomalo.com এই উদ্যোগগুলোকে আলাদা আলাদা কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সরকার ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অবকাঠামো নয়, মানুষ। এ জন্য সরকার অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের সামনে আরও কঠিন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অভিযোগ করে, তারা কাজের জন্য প্রস্তুত দক্ষ জনবল পাচ্ছে না। আবার অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছেন না। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন দ্রুত কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের চ্যালেঞ্জ শুধু আরও বেশি স্নাতক তৈরি করা নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যারা আগামী দিনের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। এ জায়গায় বিশ্বের সফল দেশগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। স্বাধীনতার সময় সিঙ্গাপুরের হাতে প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না বললেই চলে। তারা বিনিয়োগ করেছে মানুষের ওপর। আজও স্কিল ফিউচার কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের সারা জীবন নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা, শিল্পনীতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নকে একই লক্ষ্যে পরিচালিত করেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি করেনি, পাশাপাশি শিল্পের উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরি করেছে। জার্মানি কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পকারখানার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা একটি বিষয় পরিষ্কার করে—মানবসম্পদ উন্নয়ন কোনো সামাজিক ব্যয় নয়, এটি অর্থনৈতিক কৌশল। বাংলাদেশের এবারের বাজেট সেই উপলব্ধির দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু উপলব্ধি আর বাস্তবায়নের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। আমাদের দেশে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, যুব উন্নয়ন, আইসিটি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বিদেশে কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার নিয়ে নানা উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু এগুলো এখনো আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যা অনুপস্থিত, তা হলো একটি জাতীয় মানবসম্পদ কৌশল। একটি মানবসম্পদ বাজেট বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করে। কিন্তু একটি মানবসম্পদ কৌশল শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আজীবন শিক্ষাকে একই লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনায় নিয়ে আসে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতি। আমরা এখনো প্রায়ই সাফল্য মাপি কতজন ভর্তি হলো, কতজন প্রশিক্ষণ পেল বা কতটি সনদ দেওয়া হলো তার ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত: • কতজন স্নাতক অর্থবহ চাকরি পেল?