শঙ্করাচার্য (৭৮৮–৮২০ খ্রিষ্টাব্দ) আদি শঙ্করাচার্য নামেও পরিচিত। অনন্য একজন ভারতীয় দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও মরমিবাদী ছিলেন তিনি। অদ্বৈত বেদান্তের মতবাদকে সুসংগঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি বিখ্যাত। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩২ বছর, কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব অর্জন করেন। তাঁর জীবন, দর্শন, কার্যাবলি ও কবিতা (স্তোত্র) ভারতীয় আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যে বাঁকবদলকারী প্রভাব ফেলেছিল। শঙ্করাচার্য আনুমানিক ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান কেরালার কালাডি গ্রামে এক নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শিবগুরু এবং মায়ের নাম আরিয়াম্বা। ছোটবেলায়ই তাঁর বোধের তীক্ষ্ণতা চারপাশের সবাইকে চমকে দেয়। ১০ বছর বয়সের মধ্যে তিনি বেদ, উপনিষদ, ব্যাকরণ—সবই আয়ত্ত করে ফেলেন। শৈশবেই পিতা হারানোর পর, তিনি খুব অল্প বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু গোবিন্দ ভগবতপাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। গোবিন্দ ছিলেন গৌড়পাদের শিষ্য। শঙ্কর গোবিন্দের কাছে বেদ, উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও গৌড়পাদের কারিকা অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি সমগ্র ভারত ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন দার্শনিক ও পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তিনি অদ্বৈত বেদান্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তাঁর এই ভ্রমণকে দিগ্বিজয় বলা হয়। তাঁর যুক্তি ও বাগ্মিতা তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা দেয়। একটি বহুল পরিচিত ঘটনা হলো মণ্ডন মিশ্রের সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত বিতর্ক। মণ্ডন ছিলেন এক বিশিষ্ট আচারকেন্দ্রিক দার্শনিক। কিংবদন্তি অনুসারে, শঙ্করের তর্কবিজয়ের পর, মণ্ডন মিশ্র সুরেশ্বর নামে তাঁর শিষ্য হয়ে ওঠেন। শঙ্করাচার্য মীমাংসা দার্শনিক কুমারিল ও প্রভাকর এবং বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাক দার্শনিকদের সঙ্গে বিতর্ক করেন। বিভিন্ন ঐতিহ্যের পণ্ডিতদের সঙ্গে এমন বিতর্কের মাধ্যমে শঙ্কর তাঁর মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। আনুমানিক ৮২০ খ্রিষ্টাব্দে হিমালয়ের কেদারনাথে তাঁর মৃত্যু হয়। বর্ণনায় আছে, তিনি হিমালয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। অন্য কিছু ঐতিহ্য অনুসারে কাঞ্চীপুরম বা কেরালায় মহাসমাধি লাভ করেন। শঙ্করের দর্শন অদ্বৈত বেদান্ত নামে পরিচিত। উপনিষদ থেকে ধারণাগুলোকে সমন্বিত করে চিন্তার একটি সুসংগঠিত কাঠামো তিনি নির্মাণ করেন। তাঁর দর্শনের মূল কথা সরল অথচ গভীর—ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। নাম-রূপের খেলায় জগৎ আমাদের কাছে বাস্তব মনে হয়, কিন্তু তা মূলত মায়া। আমাদের ব্যক্তিগত আত্মা বাস্তবে আলাদা কিছু নয়; সেটা ব্রহ্মেরই প্রতিফলন। এটা উপলব্ধি হলে মুক্তি আসে। কথাটা শোনায় খুব বিমূর্ত, কিন্তু শঙ্কর এই ভাবনাকে বুদ্ধিবৃত্তির কাছে স্পষ্ট ও যুক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। ব্রহ্ম হলেন অসীম ও গুণাতীত সত্তা। তাঁর কোনো রূপ নেই, গুণ নেই, কোনো ভেদ নেই। ভাষা তাঁকে বর্ণনা করতে পারে না। অথচ এই অসীমই সবকিছুর ভেতরে বিদ্যমান। এই ব্রহ্ম, যিনি চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়, নিরাকার ও অসীম চেতনা, তিনিই বাস্তব সত্য; আর সবকিছু মায়া তথা ভ্রান্তি। তুমি, আমি, সব জীব—আমরা মূলত এই চেতনারই প্রকাশ। যখন আমরা শরীর-মনকেই ‘আমি’ ভেবে বসি, তখন থেকেই দুঃখের শুরু। এটাই মায়া, এটাই অবিদ্যা। এই ভুল ভাঙলেই মুক্তি। বিষয়টা দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধির ব্যাপার। ‘আমিই ব্রহ্ম’—এই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারাই হলো আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পরাকাষ্ঠা। এ বিষয়ে তাঁর রচনায় কিছু মহাবাক্য রয়েছে, যেমন ‘তত্ত্বমসি’ (তুমি সেই), ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ (আমি ব্রহ্ম), ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ (প্রজ্ঞাই ব্রহ্ম) এবং ‘অয়ং আত্মা ব্রহ্ম’ (এই আত্মা ব্রহ্ম) ইত্যাদি। এই অদ্বৈত সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হলে মুক্তি বা মোক্ষ অর্জন করা হয়। এর জন্য শঙ্করাচার্যের মতে শ্রেষ্ঠ হলো জ্ঞানের পথ বা জ্ঞানযোগ। কর্ম, ভক্তি—সবই দরকার, কিন্তু শেষ চাবিকাঠি জ্ঞান। নিরাকার পরমের ওপর জোর দিলেও, শঙ্কর প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে আচার, ভক্তি ও ঐশ্বরিক রূপগুলোর ধ্যানের মূল্যকেও স্বীকার করেছিলেন। এটা বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় করতে সহায়তা করেছিল। শঙ্করের দর্শন ও কাজ শুধু হিন্দু দর্শনকে নয়, ভারতীয় চিন্তার শিকড়কে বদলে দিয়েছে। উপনিষদের মূল সুর তিনি এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে তা আজও আধুনিক দর্শন, মনোবিজ্ঞান, এমনকি কোয়ান্টাম দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায় হাজির হয়। গুরু-শিষ্য পরম্পরা, মঠসংস্কৃতি, বেদান্ত শিক্ষা, সংস্কৃত ব্যাখ্যা-পদ্ধতি—সব জায়গায় তাঁর ছাপ। সংক্ষেপে বললে, মাত্র তিন দশকের জীবনে তিনি করেছেন শতাব্দীর কাজ। তাঁর চিন্তা এখনো সাগ্রহে অধীত হয়। তাঁর যে কৃতিত্বপূর্ণ কাজগুলোর কারণে ভারতের চিন্তাধারা বদলে গেল, তার একটি হলো বেদান্তের ভাষ্য রচনা। তিনি ব্রহ্মসূত্র, উপনিষদ, ভাগবত গীতা—এই তিন ভিত্তিমূল গ্রন্থের ওপর ভাষ্য লিখলেন। এগুলোকে প্রস্থানত্রয়ী বলা হয়। শুধু ব্যাখ্যা নয়, এগুলোই তাঁকে অদ্বৈতের প্রতিষ্ঠাতা রূপে দাঁড় করাল। তিনি ভারতের চারটি প্রধান দিকে চারটি পীঠ বা মঠ প্রতিষ্ঠা করেন: উত্তরে বদরিকাশ্রম, দক্ষিণে শৃঙ্গেরি, পূর্বে পুরী, পশ্চিমে দ্বারকা—ভারতের চার কোণে চার মঠ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলো আজও শঙ্কারাচার্যের পীঠ নামে পরিচিত ও অদ্বৈত বেদান্তের প্রচার ও সংরক্ষণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এগুলো শুধু আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যের বীজও। এগুলো তাঁর শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। এগুলো দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের কেন্দ্র, যা ১০টি নাম (যেমন গিরি, পুরী) দিয়ে সন্ন্যাসীদের সংগঠিত করে। হিন্দুধর্মের বহুত্বকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি পঞ্চায়তন পূজা প্রচার করেন, যেখানে গণেশ, সূর্য, বিষ্ণু, শিব এবং দেবীকে এক ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ হিসেবে পূজা করা হয়—এতে বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত সম্প্রদায়কে একত্রিত করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমিয়ে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কার্যাবলি হিন্দুধর্মকে সংহত করে। শঙ্কর ছিলেন একজন বহুগ্রন্থের প্রণেতা। ৩০০টির বেশি রচনা তাঁর বলে দাবি করা হয়। তবে পণ্ডিতেরা সব কটিকে প্রামাণিক বলে মনে করেন না। এই গ্রন্থগুলো তাঁর অদ্বৈতবাদ ব্যাখ্যা করে। শঙ্করাচার্য ছিলেন এক অসাধারণ কবি। তাঁর রচিত অসংখ্য স্তোত্র ভক্তিমূলক সাহিত্য হিসেবে আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়। এগুলো উচ্চাঙ্গের সাহিত্যকর্মের উদাহরণ। তাঁর স্তোত্রগুলো গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে সহজ ও মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় প্রকাশ করে। এই কবিতাগুলো বিভিন্ন দেবতার প্রতি ভক্তি প্রকাশ করে, একই সঙ্গে অদ্বৈত বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শঙ্করাচার্য ছিলেন দার্শনিক, তবে তাঁর কবিতা দেখলে মনে হবে তিনি ছিলেন অন্তরঙ্গ সাধক। যুক্তি ছিল তাঁর মন, কবিতা ছিল তাঁর হৃদয়। তাঁর কবিতা দর্শনকে সহজ করে, ভক্তিকে উদ্দীপিত করে। শঙ্করের দর্শন ও কাজ শুধু হিন্দু দর্শনকে নয়, ভারতীয় চিন্তার শিকড়কে বদলে দিয়েছে। উপনিষদের মূল সুর তিনি এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে তা আজও আধুনিক দর্শন, মনোবিজ্ঞান, এমনকি কোয়ান্টাম দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায় হাজির হয়। গুরু-শিষ্য পরম্পরা, মঠসংস্কৃতি, বেদান্ত শিক্ষা, সংস্কৃত ব্যাখ্যা-পদ্ধতি—সব জায়গায় তাঁর ছাপ। সংক্ষেপে বললে, মাত্র তিন দশকের জীবনে তিনি করেছেন শতাব্দীর কাজ। তাঁর চিন্তা এখনো সাগ্রহে অধীত হয়। সন্দেহ-মুক্ত, নিরাকার আমি।জ্ঞানেই আছি, জ্ঞানের মধ্যেই আছি, সর্বত্র—ইন্দ্রিয়-ধারণার ঊর্ধ্বে।আমি সব সময় এক, অপরিবর্তিত।বন্দী নই, মুক্তও নই—আমি শুধু আছি। শ ঙ্ক রা চা র্যে র ক বি তা ১. ঋষি-রাজ জনক এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার শহরটাকে আগুনে জ্বলতে দেখছেন। ‘অশেষ আমার ঐশ্বর্য,’ তিনি বললেন, ‘কারণ আমার নিজের বলে কিছুই নেই। এই মিথিলা ভেঙে পড়ে যাক, লাল অঙ্গার, সাদা ছাই হয়ে যাক সব— মানুষের সমস্ত নির্মাণ মুছে যাক, তবু আমার কিছুই পুড়বে না। আমার কিছুই নেই, আর তাই আমার ঐশ্বর্য অনন্ত।’ ২. বজ্ররেখার মতো ক্ষীণ, সূর্য, চন্দ্র, আর অগ্নির সার-তরঙ্গ দিয়ে গঠিত, ষট্চক্রের ঊর্ধ্বে যাঁর অবস্থান, মহাপদ্ম–বনের মধ্যে আপনার যে প্রকাশ, যে সাধকের মন কলুষমুক্ত, বিভ্রমমুক্ত, তিনি যখন তা দর্শন করেন— তাঁর ভেতরে উপচে পড়ে পরম আনন্দের বন্যা। আমার অর্থহীন কথাগুলোও যেন জপের গুঞ্জন হয়ে ওঠে, হাতের প্রতিটি নড়াচড়া পূজার মুদ্রা হোক। হাঁটা যেন আপনার প্রদক্ষিণ, খাওয়া-দাওয়া আর দেহের সমস্ত ক্রিয়া যেন যজ্ঞের অংশ হয়ে যায়। শোয়া যেন আপনার আরাধনায় প্রণাম, আনন্দ ভোগও যেন আত্মসমর্পণের ভক্তি। আমার জীবনযাপনের প্রতিটি কাজ আপনারই কোনো না কোনো উপাসনা হয়ে উঠুক। আপনার কপালের সিঁদুররেখা— ঘন, অন্ধকার কেশের জটাজালের মধ্যে যেন নবোদিত সূর্যের একটি বন্দী রশ্মি। এই সৌন্দর্য যেন আমাদের মঙ্গল ডেকে আনে। আপনার মুখশ্রী যে অপরূপ কল্যাণের স্রোত বহায়, তারই প্রবাহের মতো মনে হয় চুলের সিঁথির সেই রক্তিম আলোকরেখা। আপনার ডান চোখ—যার উৎস সূর্য— দিনের জন্ম দেয়। আপনার বাঁ চোখ—যার সার চাঁদের আলো— রাত্রিকে সৃষ্টি করে। আর আপনার তৃতীয় নয়ন— সামান্য ফোটা সোনালি পদ্মের মতো দীপ্ত— দিন-রাত্রির মাঝের সেই গোধূলিকে রূপ দেয়। ৩.